ফিক্বাহ, ইকুয়ালিটি এবং মেয়েদের নিয়ে দ্বন্দ্বের ধারা

ইসলামিষ্টসদের কাছে “ইকুয়ালিটি” শব্দটা একটা বিষাক্ত ফেমিনিষ্ট শব্দ।

অথচ যত পড়ি তত দেখি-

ইসলামিক জুডিশিয়ারীতে যে রুলিংসগুলো আছে মেয়েদেরকে নিয়ে, যা মূলতঃ ক্লাসিকাল জুরিষ্টস এবং ক্বাদীরা রায় দিয়েছেন, যেগুলোকে এখন শরীয়াহ বলা হয়,

অলমোষ্ট প্রতিটা রুলিংসকে বের করে আনতে গিয়ে ঠিক তাইই করা হয়েছে যা ফেমিনিজমকে একিউজ করা হয়!

মেয়েদের আর ছেলেদের রোল এবং রেস্পনসিবিলিটিকে “ইকুয়ালিটি” দিয়ে মাপতে চেষ্টা করা হয়েছে!

মোটেও ইকুইটি দিয়ে করা হয়নি।

ইকুয়ালিটি আর ইকুইটির মধ্যে পার্থক্যটা কেমন?

যেমন আপনার কাছে একটাকার নোট আছে আরেকজনের কাছেও একটাকার নোট আছে। তাহলে ইকুয়াল হলো।

আর ইকুইটি হচ্ছে, আপনার কাছে এক টাকার নোট আছে, আরেকজনের কাছেও এক টাকা আছে কিন্তু তার এক টাকা হচ্ছে পঞ্চাশ পয়সা, দশ পয়সা, আর দুইটা বিশ পয়সা মিলে এক টাকা।

টাকা সমান সমান আছে, কিন্তু হুবুহু এক টাকার নোট নাই, ডিফরেন্ট ফর্ম আর শেইপে আছে।

ফেমিনিজমের মধ্যেও এখনকার কন্টেম্পরারী অনেক ফেমিনিষ্টসরা বলছেন ছেলে আর মেয়েদের মধ্যে ইকুয়ালিটি না, ইকুইটি লাগবে, কারণ তাদের স্কোপ, তাদের এক্সপোজার, তাদের চাহিদা, অপরচুনিটি সবকিছু ভিন্ন ভিন্ন।

কিন্তু আমাদের ক্লাসিকাল উলামাদের বেশীরভাগ উলামারা কী করেছেন?

উনারা ইকুয়ালিটি খুঁজেছেন এবং তা করতে গিয়ে মেয়েদেরকে ভীষণ রকম অসুবিধায় ফেলে দিয়েছেন।

যেমন আল্লাহ্‌ কুর’আনে মোহরানা (মাহার) এর জন্য যে চারটা শব্দ ইউজ করেছেন, (সাদাক্ব, ফারিইদা, আজার, নি’হলা) চারটা আয়াতেই এই শব্দগুলোর সবচে’ গ্রহণযোগ্য অর্থ হচ্ছে গিফট, উপহার।

একটা আয়াতে তো একদম কোনো কনফিউশান যেন না থাকে একদম ক্লিয়ার করে বলা হয়েছে ‘তাদেরকে সাদাক্ব (মোহরানা) ফ্রী গিফট হিসেবে দাও’ (৪:৪)।

আল্লাহ্‌ যেখানে কুরআনে স্পষ্ট করে বলেছেন ‘ফ্রী গিফট’ হিসেবে দাও, সেখানে শরীয়াহতে এসে সম্মানিত আলেমরা এই মাহারকে বানিয়ে দিয়েছেন সেক্সুয়াল এক্সেসের দাম! বিনিময় মূল্য!!

এই “দাম” এর আইডিয়া কোত্থেকে আসলো?

ঐ যে ইকুয়াল কিছু তো বিনিময়ে পাইতে হবে!!

উনাদের চিন্তা হলো- একটা ছেলে শুধু শুধু কেনো গিফট দিবে তার বউকে?! “বিনিময়” কী?

ইকুয়ালিটিতে সবসময় তুমি আমাকে যা দিবা, আমি তোমাকে তার বিনিময়ে সমান সমান দিবো। এই যে ধারনা- এই ধারনা মেয়েদেরকে নিয়ে রুলিংস এর পদে পদে!

এমনকি আল্লাহ্‌ যতই বলে দিন মোহরানা হচ্ছে পিউর একটা গিফট, এবং এই গিফট দিতে গিয়ে কোনো জামাই যদি ‘ক্বিনতার’ সমান গিফটও দিয়ে দেয় (ক্বিনতার হচ্ছে অনেক অনেক অনেক ধন সম্পদ), তাহলেও ঐ জামাই যেন কোনোদিন তা থেকে কিছু ফেরত না চায় (৪:২০)।

কিন্তু কুর’আনের আয়াতের একদম অপজিটে গিয়ে শরীয়াহ কী করেছে? মুসলিম আইনে কী করা হয়েছে?

বউ যদি ডিভোর্স চায় তাহলে তাকে তার মোহরানা (পুরা বা আংশিক) ফেরত দিতে হবে!! (একদম কুর’আনের আয়াতের অপজিট)।

মানে, আমার জীবনে দেখা বেষ্ট থ্রিলার মুভিতেও আমি এমন টুইস্ট দেখি নাই, যে টুইস্ট আমি ফিক্বাহ আর মুসলিম আইন নিয়ে পড়তে গিয়ে দেখি!

সবগুলো রুলিংস, মেয়ে নিয়ে সবগুলো রুলিংস- ফিক্বাহতে, শরীয়াতে, মুসলিম আইনে- সব জায়গায়, “ইকুয়ালিটি” আর “বিনিময়” এর ধারনার উপর বেইস করে বানানো।

তাই মোহরানার “বিনিময়” খুঁজতে গিয়ে আরেক চরম টুইস্ট।

কী রকম?

বলছি।

সেক্সুয়াল এক্সেস দুইজনেরই অধিকার। জামাই আর বউ দুইজনেরই। এজন্যেই জামাই যদি বউয়ের ফিজিক্যাল নীড পূরণ করতে না পারে, তাহলে সেই গ্রাউন্ডে বউ ডিভোর্স চাইতে পারবে।

আবার সেইম বউ যদি মাইনর হয়, বা সিক্‌ হয় যার কারণে জামাইয়ের ফিজিক্যাল নীড পূরণ করতে পারছেনা, তখন জামাই ডিভোর্স দিতে পারবে।

তো- ফিক্বাহ’র রুলিংস দিয়েই প্রমাণ হচ্ছে সেক্সুয়াল এক্সেস দুইজনেরই ম্যারিটাল অধিকার। ঠিক?

কিন্তু সম্মানিত আলেমগণ এই রাইটকে আলাদা করে শুধুমাত্র জামাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়ে এটাকে মোহরানার “বিনিময়” বানিয়েছেন;

কেনো?

কারণ উনারা এই সেক্সুয়াল এক্সেসকে এমনভাবে “বিনিময় মূল্য” হিসেবে এক্সপ্লেইন করেছেন যাতে করে মেয়েটার ফিজিক্যাল মোবিলিটিকে আটকে ফেলা যায়।

এই মেয়ে ঘর থেকে বের হতে পারবেনা কারণ সে যখন বাইরে যাবে তখন যদি জামাই’র ফিজিক্যাল নীডের দরকার হয়?

তাই সে ঘরের বাইরে যেতে পারবেনা।

এখন আমার প্রশ্ন হলো-

তাহলে একটা জামাই কীভাবে ঘরের বাইরে যায়?! জামাই যখন ঘরের বাইরে যাবে তখন যদি মেয়েটার ফিজিক্যাল নীড লাগে?!

তখন ময়নার বাপকে সে কোথায় পাবে? ময়নার বাপেরও তাহলে তো ঘরের ভিতর বসে থাকা উচিত সারাদিন!

এই রুলিংসগুলো পড়লে মনে হবে জামাই একটা সেক্সুয়াল এনিমেল, যার শরীর আর শরীরের চাহিদা ছাড়া এই দুনিয়াতে আর কিছুই এক্সিষ্ট করে না!

এমন সব টুইস্ট এন্ড টার্ন দিয়ে ভরা এই রুলিংসগুলো!

আর প্রত্যেকটা রুলিংস’র ফাউন্ডেশনাল আইডিয়া হচ্ছে “ইকুয়ালিটি” আর “বিনিময়”।

জামাই যাইই করে, তার বিনিময় লাগবে!

তার ইকুয়াল প্রতিদান লাগবে!!

সে মোহরানা দিছে, তার বিনিময়ে কিছু লাগবে!

সে টাকা কামায় সংসারের জন্য, তার বিনিময়ে কিছু লাগবে!

সবকিছুতে ইকুয়াল বিনিময় মূল্য লাগবে।

অথচ ইকুয়ালিটি শব্দটা শুনলেই ইসলামিষ্টসরা এমনভাবে জাম্প দেয় যেন তাদেরকে কারেন্ট শক্‌ দিয়েছে।

এইগুলা জাস্ট এমনি বললাম আর কি। গালি না দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখতে পারেন।

আম্মু একটা কথা বলে – যে যারে নিন্দে/ সে তারে পিন্দে!

ফেমিনিজমকে ইকুয়ালিটি নিয়ে গালি দিয়ে দিয়ে, ফিক্বাহতে আর মুসলিম আইনে যখন দেখি খালি ‘ইকুয়াল বিনিময়’ এর উপর ভিত্তি করে মেয়ে-বিষয়ক সব রুলিংস বানানো, তখন সত্যি বলছি, দুঃখ লাগে।

ইসলামকে কি আর সাধে মানুষ ভুল বুঝে?!

Author

Previous Post
Next Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »