সারাদিন আকাশে বিস্তর মেঘ। মেঘগুলো উড়ে উড়ে কোথাও যাচ্ছে না। স্থির পাহাড়ের ওপর ততোধিক স্থির গম্ভীর হয়ে বসে আছে। যেন দীর্ঘদিন ঘুরে ফিরে ক্লান্ত একদল আশ্চর্য মেঘ। রাশি রাশি জলজ মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখি ওই দুরের ছোট একটা জানালায় দেখি নরম হলুদ বাতির নিচে এক মাঝারি আকৃতির মধ্যবয়সী জার্মান টেবিলের ওপর মাথা ঝুঁকিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে একটা পোস্ট কার্ডে দ্রুত লিখছে- “যাবার আগে যত চিঠি আমি লিখে যেতে চেয়েছিলাম, সেগুলো লিখে শেষ করার মত পর্যাপ্ত সময় আমার হাতে নাই”।
পোস্টকার্ডটা কোথাও ছিলো না।বেনিয়ামিনের এক সফরসঙ্গী মিস গারল্যান্ডের মুখে আমরা পোস্টকার্ডটির কথা শুনতে পাই। মিস গারল্যান্ড পোস্টকার্ডটি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। কারণ, পরিস্থিতি অসম্ভব খারাপ ছিলো। ইহুদিরা সহ ইয়োরোপের বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরা দলে দলে সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছে। সবাই প্রাণে বাঁচতে পালাচ্ছে এক সীমান্ত থেকে আরেক সীমান্তে। ধরপাকড় চলছে প্রচুর। এই পরিস্থিতিতে কোন ধরণের চিঠি চালাচালির মত জটিল কাজে অংশ নিতে চান নাই মিস গারল্যান্ড। সুতরাং, পোস্টকার্ডটা আর কোথাও ছিলো না। ফলে কেউ কেউ বলতে থাকেন ওয়াল্টার বেনিয়ামিন আত্মহত্যা করেন নাই। তারা আর বলেন, তাকে শুধু হত্যাই করা হয় নাই তার মহামূল্যবান যে পাণ্ডুলিপিটা রক্ষার কথা তিনি সফরসঙ্গীদেরকে বেশ কয়েকবার বলেছিলেন, সেই পাণ্ডুলিপিটাও আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় নাই। তার সফরসঙ্গী মিস গারল্যান্ড শুধু পোস্টকার্ডটির কথা উল্লেখ করেন।
তার ভাষ্যমতে পোস্টকার্ডে বেনিয়ামিন লিখেছিলেন, “এই অবস্থায় বাঁচবার কোন উপায় নাই, তাই এইখানেই ইতি টানা ছাড়া আমার আর বিকল্প পথ নাই। আমার জীবন শেষ হবে পিরেনিজের একটা ছোট গ্রামের একটা কোনায়, যেইখানে কেউ আমাকে চিনে না।যাবার আগে যত চিঠি আমি লিখে যেতে চেয়েছিলাম, সেসব লিখে শেষ করার মত পর্যাপ্ত সময় আমার হাতে নাই”।
ঘটনাটা ঘটেছিলো সেপ্টেম্বর মাসের একদম শেষ দিকে। সেইসময় ফ্রান্স আর স্পেনের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এত ঘন মেঘ জমে কি না জানি না। তবে, বেনিয়ামিনের শেষ দিনটার দুর্যোগ যেন তার নিয়তি ছিলো। জানা যায়, এমন কি তার আগের দিনও এই অঞ্চল দিয়ে রিফিউজিরা যাতায়াত করছিলো। কিন্তু হঠাত করে সেদিনই একটা নিষেধাজ্ঞা আসে যেখানে বলা হয় স্পেইনের মধ্য দিয়ে যাতায়াতের অনুমতি যাদের নাই তাদেরকে আবার ফ্রান্সে ফিরে যেতে হবে। ফ্রান্সে বেনিয়ামিন ছিলেন নথিনম্বরবিহীন একজন রিফিউজি। সুতরাং সেই দেশ তাকে স্পেনে যাবার অনুমতি দিবেনা। ফ্রান্সে থাকাকালীন তার বন্ধু, স্বজন, প্রাক্তনেরা তাকে নানান ভাবে ফ্রান্স ছাড়তে বলছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু বেনিয়ামিন তখন হয়তো একজন একনিষ্ট ফ্লানো। উনিশ শতকের প্যারিসে মূলতঃ মধ্যবিত্ত আর উচ্চ মধ্যবিত্ত লোকেরা সেজেগুজে হাতে ছাতা নিয়ে প্যারিসের রাস্তায় ফুটপাথে, অথবা আধখোলা আরকেডের রাস্তায় আপাত উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতো। হয়তো তাদের একটা অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো সকলকে জানান দেয়া যে তারা শ্রমিকদের মত ভারবাহী গর্দভ নয়। তারা মন চাইলেই ধোপদুরস্ত পোশাক গায়ে চড়িয়ে প্যারিসের রাস্তায় মানুষ দেখে, শহরে আসা নানান পদের জিনিসপত্র দেখে দিনের অনেকটা সময় কাটিয়ে দিতে পারে। ওয়াল্টার বেনিয়ামিন নিজে জন্মেছিলেন উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে।যদিও তিনি মার্ক্স প্রভাবিত, তবুও কেউ কেউ বলেন তিনি স্লাইটলি বুর্জোয়া ছিলেন। ফ্রান্সে যদিও তার তেমন বড় কোন কাজ জোটেনাই, বৃত্তি ইত্যাদির ওপর ভর করে দিন চলে যাচ্ছে, তবে তার বেড়ে ওঠায় যে বুর্জোয়া প্রভাব ছিলো সেইটা বেনিয়ামিন হয়তো সেভাবে লুকাতেও চান নাই। সুতরাং, স্যুট কোট পরে, হাতে একটা ছাতা নিয়ে বড় বড় গম্ভীর লোহা আর গ্লাসে আধখোলা আরকেডের গলি তস্য গলি হেঁটে হেঁটে মানুষ দেখা, বাজার দেখা তার পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়। সবকিছুর মাঝে আরকেডস প্রজেক্টের কাজ গোছান। কোন কোনদিন বৃষ্টি হয়, কোন কোনদিন ফ্রান্সের আকাশে আশ্চর্য মেঘদল। বেনিয়ামিন অবাক আরকেডের আধখোলা আকাশ দেখেন। তিনি জানেন, এই কাজটা ঠিকভাবে শেষ করতে হলে তাকে প্যারিসেই থাকতে হবে। তাই এই শহর ছাড়তে তার মন চায় না।
মাঝে মাঝে ভাবি, ওয়ালটার বেনিয়ামিনতো খুব ভালো করেই জানতেন, সভ্যতার এইসব বিশাল বিশাল লোহায় মোড়ানো দালানের নিচেই আছে বর্বরতার স্মৃতি; তবুও প্যারিসের হইহট্টগোল, নানান রকম মানুষ, বিশাল বিশাল শিল্পকর্ম, দেখে বেনিয়ামিন হয়তো ভেবেছিলেন তার মত একজন মানুষকে প্যারিস রাখতে চাইবে না, তা কী করে হয়!
কিছুদিন আগে ইয়োরোপ থেকে প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে আসার পারিবারিক স্মৃতিকে সাথে নিয়ে বড় হওয়া ইতিহাসের এক অধ্যাপক বললেন, তিনি প্রায়ই বেনিয়ামিনের শেষ দিনটার কথা উল্টে পাল্টে ভাবেন। যদি একদিন আগে কিংবা একদিন পরেও তাদের দলটা পোর্টব্যুতে পৌঁছাতো তাহলে হয়তো বেনিয়ামিনের শেষ পাণ্ডুলিপিটা হারিয়ে যেতো না।
সুতরাং, এই একটা দিনকে ছাইরঙা ব্যাকড্রপেই আমি দেখি। দেখি একটা ছোট ঘর, মাথার ওপর একটা জানালা থাকায় ঘরটা যেন বাধ্য হয়ে প্রকাশ্যে এসে কিছুটা সংকোচে আলগোছে লোকের চোখ বাঁচিয়ে নিজের গোপনীয়তা রক্ষা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সেই ঘরের মরা হলুদ আলোয় কাঁপা কাঁপা হাতে একটা লোক বিদায় জানাচ্ছে এই পৃথিবীকে। আমি অতি দূর থেকে মেঘের মধ্যে দেখি এই ছবি। লোকটার ইতস্তত আবছা মুখ দেখে বোঝা যায় না, জীবনের শেষ কয়েকটি ঘণ্টা ঠিক কোন অনুভূতি দ্বারা তাড়িত হচ্ছেন ভদ্রলোক। ক্ষোভ? অভিমান? তীব্র হতাশা? প্রচণ্ড ভয়? তিনি কিছুতেই গেস্টাপো বাহিনীর কাছে ধরা পড়তে চান নাই। এই জন্যই কি শেষ পর্যন্ত নিজের নিয়তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন বেনিয়ামিন?
স্পেইনের সীমান্তবর্তী শহর পোর্টব্যুতে আসার পথ বড় দুর্গম ছিলো। ফ্রান্সের শহর থেকে পোর্টব্যুতে আসার জন্য পিরেনিজের দুর্গম পাহাড় পাড়ি দিতে হয়েছিলো বেনিয়ামিনকে। দীর্ঘদিনের পরবাসে তার শরীর ছিলো অশক্ত আর রোগে ভোগা। পথে তিনি বারবার বলেছিলেন তার পাণ্ডুলিপিটা রক্ষা করতে হবে। একটু পরপর বসে জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। প্রাণপণে বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। বেনিয়ামিন আমাদের মত সাধারণ মানুষ ছিলেন। তার কোন নিশ্চিত আয় ছিলো না। একেকটা কাজ অথবা লেখা জমা দিয়ে তিনিও আমাদের মত বড় আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতেন কোন একটা ভালো খবরের আশায়। বেনিয়ামিন অতি সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন, আমাদের মতই; নাগরিকের নথিনাম্বারের জন্য অফিসে আদালতে বারবার যোগাযোগ করতে যার ইচ্ছা করতো না। বেনিয়ামিন হিরো ছিলেন না, অথবা একজন নবী ছিলেন বেনিয়ামিন।
পিরেনিজের যেই দুর্গম পথ ধরে বেনিয়ামিন স্পেইন সীমান্তে উপস্থিত হয়েছিলেন সেই পথটা এখন ওয়াল্টার বেনিয়ামিন ট্রেইল হিসেবে পরিচিত। এখন ওয়াল্টার বেনিয়ামিনের ভক্ত-অনুসারীরা তার এই ঐতিহাসিক হাইকিং-এর স্মৃতিকে বারবার উৎপাদন করতে চায়। মা হাজেরার অনুসারীরা যেমন সাফা-মারওয়ায় ছুটে ছুটে সন্তানের জীবন রক্ষার জন্য হাজেরার সমর্পণের স্মৃতি হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বুকে মঞ্চস্থ করে যাচ্ছেন। ওয়াল্টার বেনিয়ামিনের তীর্থযাত্রীরাও বারবার এই গল্পের পুনঃমঞ্চায়ন করে। আর এখনো দুনিয়ার নানান সীমান্তে নথিনম্বরবিহীন মানুষেরা প্রাণ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই পথে পাড়ি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার একমাস আগের এক চিঠিতে ওয়াল্টার লিখেছিলেন, “পরের দিন, এমন কি পরের কয়েক ঘণ্টায় আমার জীবনে কী ঘটতে পারে এই বিষয়ে সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তাই গত কয়েক সপ্তাহে আমার জীবনে প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে”। তিনি যখন পিরেনিজের দুর্গম হাইকিং ট্রেইল পাড়ি দিচ্ছিলেন তার মাথায় ছিলো প্রাণভয়। আশঙ্কায় পথ হয়ে গেছিলো আরো বেশি ভারী।
মনেপ্রাণে ইওরোপিয়ান বেনিয়ামিন নিয়তিকে ঠিক আলিঙ্গন হয়তো করতে পারলেন না; একজন অকুল দরিয়ার মাঝখানে বসে থাকা বাঙালির মত তিনি তার সমস্ত কিছু সমর্পণ করে দিয়ে অচিন এক পড়শিকে ডেকে বলতে পারেন নাই যে তিনি অপার হয়ে বসে আছেন, যেন দয়াময় বন্ধুটি তাকে পারে নিয়ে যায়। অথবা এই একটা দুর্যোগে ভরা দিনই ছিলো তার নিয়তি।
বিঃদ্রঃ আমরা ব্যক্তিগত হজ্বযাত্রার তালিকা প্রতিনিয়ত বর্ধিত ও পরিমার্জিত হচ্ছে।