জুলাই আমার কাছে সাহসের নাম। কারফিউ-এর দিনগুলো ছাড়া প্রায় প্রতিদিনই রাস্তায় থাকার চেষ্টা
করেছিলাম। এর পিছনে কারা আছে, কী প্ল্যান, কী পরিকল্পনা এসব জানার চেষ্টাও করিনি। শুধু বুঝেছিলাম এই
অন্যায়ের প্রতিবাদ হওয়া দরকার, চেয়েছিলাম এই গুম, খুন, হত্যা, নির্যাতন, দেশ দখল – সবকিছু বন্ধ হওয়া
দরকার। এই অন্যায়ের প্রতিবাদ আমি রাস্তায় নেমে করেছি শুধু ফেসবুকে নয়। এই প্রতিবাদ আমি আমার
দায়িত্ব মনে করে করেছি। রাস্তায় নেমে প্রতিদিন ছেলেমেয়েদের মরতে দেখেছি, মার খেতে দেখেছি, কোপ খেতে
দেখেছি বলেই জুলাইকে আমার মন থেকে মুছে ফেলা কঠিন। আমার মনে পড়ে হাটুতে লাঠির বাড়ি খাওয়া একাদশ
শ্রেনির ছেলেটার কথা, খুড়িয়ে খুড়িয়ে এসে আমার পাশে রাস্তায় শুয়ে পড়েছিল, যাকে আমি বাসায় পৌছে দিতে
চেয়েছিলাম কিন্তু সে বলেছিল এতো সহজে যাবোনা। আমার মনে পড়ে বুকে পিঠে ব্যাগ নিয়ে মিছিলে আসা
মেয়েগুলোর কথা। জুলাই – মনে করলেই ভিতর থেকে কেঁপে উঠে শরীর। জুলাই আমার কাছে সাহস। না, সংস্কার
টংস্কারের স্বপ্ন আমি দেখিনি। আমি জানি সংস্কার এতো সহজ না। সংস্কার ভিতর থেকে আসার বিষয়। একটা
কাঠামো অবিকৃত রেখে মাথা বদলে ফেলে সংস্কার আসা করা বোকামি। তাবেদারি, তেলবাজ, দুর্নীতিবাজ, ধর্মীয়
গোড়ামিতে অন্ধ সামাজিক কাঠামো অবিকৃত রেখে সংস্কার কঠিন। এইসবের পরিবর্তনের জন্য যে সামাজিক,
সাংস্কৃতিক আন্দোলন দরকার সেসব না করে সংস্কার আশা করাও বোকামি। নয় মাস যুদ্ধের পরেও অনেক
মুক্তিযোদ্ধা হতাশায় উচ্চারণ করেছিলেন – এই স্বাধীনতা কি চেয়েছিলাম? সংস্কার তখনো হয়নি। কর্নেল
তাহেরের একটা লেখায় পড়েছিলাম তিনি যুদ্ধকে আরো দীর্ঘ সময়ের জন্য চেয়েছিলেন যাতে প্রতিটি মানুষ
জীবন দিয়ে বুঝে- কী চাচ্ছি, কেন চাচ্ছি। মানুষের চিন্তা -ভাবনা, মননের পরিবর্তন না হলে সংস্কার কঠিন। এই
জায়গায় আমাদের চিন্তা নেই, কাজ নেই, পরিকল্পনা নেই। এখনো কতো কতো কাজ করা বাকি, অথচ “আমি
এখনও প্রস্তুত হতে পারি নি, আমার অনবরত
দেরি হয়ে যাচ্ছে”। জানিনা প্রস্তুত হতে পারবো কিনা, শুরু করতে পারবো কিনা, তবু চাই জুলাই আমাদের সেই
সাহস দিক…

Author: ছন্দা মাহবুব
[ছন্দা মাহবুব (১৯৭৭) পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে।
উন্নয়ন কর্মী এবং ন্যায় ভিত্তিক অধিকার আদায়ের যোদ্ধা
হিসেবে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি অনুবাদ
কাজের সাথে জড়িত। অনুদিত বইয়ের সংখ্যা ৭টি।]