মাঝে মাঝে মনে হয়, কোন একটা বাড়ির একটা কোণে মাটির দাওয়ায় বসে থাকা বুড়ো লোকটার মত হয়ে যাই; ভীষণ নিঃস্পৃহ। লোকটার দৃষ্টি দেখে ঠিক বোঝা যায় না সবকিছু দেখে আসলে সে কী ভাবছে, অথবা আদৌ সে কিছু ভাবছে কি না! এই যে, নিজেকে সমস্ত কিছু থেকে বিযুক্ত করে, বড় একটা ধূসর চাদর গায়ে মুখ মস্তক ঢেকে, সবার থেকে কিছুটা দুরে বসে সবাইকে দেখতে পারাটা দরকার। জুলাই-অগাস্টে নিজেকে সবকিছু থেকে বিযুক্ত রেখে দুরে বসে শুধু দেখে যাবার এই বিলাসিতা করা যায় নাই, সময়ের প্রয়োজন ছিলো।
এখন মনে হচ্ছে, এবার কিছুটা দুরে দাওয়ায় বসে বসে সবাইকে দেখি।
সংবাদে এসেছে ঢাবি প্রক্টরিয়াল টিম না কি গোয়েন্দাসংস্থার পরামর্শে অভ্যুত্থানের একটা অন্যতম স্মৃতি মুছে ফেলার দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। এটা আমার মানতে অসুবিধা আছে যে, ঢাবি প্রক্টরের অফিস জানে না এই দেয়ালচিত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক এই দেয়ালচিত্রটায় অনবরত জুতা নিক্ষেপের মাধ্যমে দেশের মানুষ গণঅভ্যুত্থানকে স্বাগত জানায়। ঢাবি প্রকটর টিম নিশ্চয়ই এটা জানে।
তবুও তারা কেন কোন গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শমতো চলবে? একসময় মানুষ মনে করতো ঢাবির শিক্ষকেরা বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে থাকেন পলিটিশ্যানদেরকে। এই ভদ্রমহোদয়গণকে প্রতি মাসে বেতন দেয়া হয়, প্রচুর সম্মান করা হয় এই আশায় যে তারা সমাজের দেশের উন্নয়নে প্রয়োজনে দেশের মানুষকে বুদ্ধি পরামর্শ জ্ঞান ইত্যাদি দিয়ে সক্রিয় থাকবেন। কিন্তু, বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষকেরা নিজেদের জ্ঞানের ব্যাপারে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী নন, তারা বাস্তবতা পাঠে অপারগ। তারা নিজেদের মূল্যায়ন নিজেরাই করেন না, ফলে অন্যেরাও তাদেরকে মূল্য দেবার দরকার মনে করে না। তারা এতই হীনমন্য এবং ভাগ বাটোয়ারায় বেপরোয়া যে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম একটা স্মৃতিকে তারা এনএসআই পরিচালিত কমেডি শো-তে পরিণত করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু, আমি তো দাওয়ায় বসে থাকা বুড়ো। এইসব নাটকে অস্থির চঞ্চল না হয়ে বরং দেখলাম গোটা ঘটনাটা আবার আমাদেরকে জুলাই অভ্যুত্থানের স্বতঃস্ফূর্ততা মনে করিয়ে দিলো।
বহুবিধ রাজনৈতিক উপাদান ও গোয়েন্দা-মিডিয়ার যৌথ প্রযোজনার নাটকের বাইরেও একটা বিশাল সংখ্যক জনগণ আছে যারা সময়ের ডাকে এবং প্রয়োজনে জুতা আর ঝাড়ু হাতে তাড়া করতে পারে দুনিয়ার ভয়ংকরতম সব ডিক্টেটরদেরকে। এই সত্যটা আমরা দেখেছি জুলাইতে। নাটকবাজ সংস্থাগুলো তখনো নানান নাটক তৈরির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণের ইচ্ছার কাছে নাটকের পরাজয় ঘটেছে।
অভ্যুত্থানের সময় ডিক্টেটরের মুখে জুতা ছুড়ে মেরেছিলো যারা তাদের অপরিসীম সাহস, ‘মইরা যামু কি হইছে’ মনোভাব এইসবই ওই গোটা সময়ের সাক্ষ্য দেয়। জাস্ট আউট অফ নোহয়্যার অনেকগুলা মানুষ এসে মনের সুখে ওই ছবিতে জুতা আর ঝাড়ু নিক্ষেপ করে যায় নাই। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি তৈরি হয়েছিলো দীর্ঘদিন ধরে। সেইটা কোন গোয়েন্দা নাটক ছিলো না। দাম্ভিক ডিক্টেটরকে জনতা জুতা মেরে তাড়িয়েছে প্রায় পাঁচ মাস হয়ে গেলো। এখন আপনি চাইলেও সেই দৃশ্য আর সেই ঘটনার এবং সেই ঘৃণার বোধের পুনরুৎপাদন করতে পারবেন না।
এখন আর ডিক্টেটর নাই, সুতরাং আপনি শত চাইলেও সেই প্রাক্তন ডিক্টেটরের ছবির ওপর কেউই তার নিজের পায়ের জুতা ছুঁড়ে মারবে না।
এই মানুষেরাই ঐতিহাসিক সেই ক্ষণে নিজের পায়ের জুতা ছুঁড়ে মেরেছে ডিক্টেটরের মূর্তিতে। তারপর মনের সুখে খালি পায়েই বাড়ি ফিরে গেছে। এখন কেন কেউ খালি পায়ে বাড়ি ফিরে যেতে চাইবে? ৩৬ জুলাই বারবার আসবে না, না আসাটাই দরকার। কারণ ৩৬ জুলাই যদি আবার ফিরে পেতে চান তাহলে তার আগে আপনাকে আবার কোন ভয়ংকর ডিক্টেটরকে আরো দুই যুগ মেনে নিতে হবে। সে হাজার মানুষ হত্যা করে, হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি করেও দম্ভে টনটন করবে। এর মাঝে চলবে বহুবিধ সংস্থা পরিচালিত বিচিত্র সব নাটক। তারপরেই জনগণ একটা পর্যায়ে সকল ভয় ভীতি উপেক্ষা করে প্রচণ্ড ক্ষোভে উন্মত্ত হয়ে নিজের পায়ের জুতা ছুঁড়ে দিবে ডিক্টেটরের মুখের ওপর।
ঐ স্বতঃস্ফূর্ত জুতা নিক্ষেপ, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, এবং একই সাথে মুক্তির আনন্দ ঠিক জুলাই মাসের মত করে পুনরুৎপাদন সম্ভব না।
সুতরাং, ডিসেম্বরে এসে জুলাইয়ের একটি বিশেষ মুহূর্তের পুনরুৎপাদন ঠিক আগের মত করে করা সম্ভব না। এইসব পুনরুৎপাদন নাটকের মাধ্যমে মূলত আমরা বারবার সেই আদি মুহূর্তটিকে স্মরণ করবো। সেই মুহূর্তের স্বতঃস্ফূর্ততা কেন এখন নাই সেই প্রশ্ন করা বোকামি।
বরং, সেই স্বতঃস্ফূর্ততা কোন নাটক বা প্ল্যানের মাধ্যমে যে তৈরি করা হয় নাই এই বাস্তবতাটাও আমরা আরো বেশি করে বুঝতে পারছি এই পুনরুৎপাদন চেষ্টার মাধ্যমে।
আর ঢাবি-র শিক্ষক প্রক্টরগণ, আপনারা যে সংস্থার আদেশে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত স্মৃতি চিহ্ন মুছে দিলেন এইজন্য আপনারা এখনো কেন যথেষ্ট লজ্জিত নন? আপনাদের কি কখনোই লজ্জা হবে না?