২৮ জুলাই
স্থানঃ বাংলাদেশের কোন এক প্রান্তের ফাউন্ডেশন ট্রেনিং একাডেমি।
সময়ঃ ভোর ৬ টা।
একদল স্বাস্থ্য ক্যাডারের প্রশিক্ষণার্থীরা দাঁড়িয়েছে মাঠে সকালের পিটিতে অংশ নিতে।নিয়ম অনুযায়ী শুরু হয় কোরান তেলওয়াত ও কিছু ভালো কথামালা দিয়ে।
ডাক্তারদের অনেকের চোখ রক্তিম, মন বিষণ্ণ; অন্তরে ক্ষোভ। ইন্টারনেট যতটুকু আসছে, ভিপিএন দিয়ে কোনমতে কিছু কিছু আপডেট পাওয়া যাচ্ছে।
পুরো দেশ রক্তাক্ত;
৫০০ এর উপর লাশের উপর দাঁড়িয়ে দেশ।
অথচ তারা কিছুই করতে পারছে না। ছোটভাইদের বয়সী জেন জি রা রাস্তায় নেমে এক মহাবিপ্লবের ডাক দিয়ে যাচ্ছে। অথচ তারা কিনা এক বদ্ধ পরিবেশে,কঠোর নিয়মের মাঝে সরকারি কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নিজেদের প্রতিই অনেকের ঘৃণা চলে আসে।এই অক্ষমতার জন্য।
রোল নাম্বার অনুযায়ী একজন ডাক্তার এগিয়ে গেলেন। কুরান থেকে তেলাওয়াত করার জন্য। অন্যদিন সবাই সূরা নাস বা সূরা কাওসার পড়ে কোনমতে দ্বায়িত্ব পালন করে। কিন্তু সেই ডাক্তার, ধরে নিলাম তার নাম জুলাই। তিনি একটু সময় নিয়ে পাঠ করলেন,
‘সেদিন সম্পর্কে তুমি মানুষকে সতর্ক কর যেদিন তাদের শাস্তি আসবে, যেদিন জালিমরা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের কিছু কালের জন্য অবকাশ দাও, আমরা তোমার আহ্বানে সাড়া দেব এবং রাসূলদের অনুসরণ করব। (তখন তাদের বলা হবে,) তোমরা কি পূর্বে শপথ করে বলতে না যে, তোমাদের কোনো পতন নেই? (সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪২-৪৪)’
আরবিতে তেলাওয়াত করার সময় অনেকে না বুঝলেও যখন বাংলায় তরজমা করা হল তখন অনেকে হতবাক, অনেকের চোখ দিয়ে পানি বেয়ে পড়তে লাগলো, অনেকে হাত কিছুক্ষণের জন্য শক্ত মুঠো করে রাখলো। এরপর উপদেশমালা বলার সময় সেই ডাঃ জুলাই দুইটা হাদীসের প্রসঙ্গ আনলেন।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে জুলুমের পরিণাম সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো, কারণ জালিম কেয়ামত দিবসে ঘোর অন্ধকারে নিপতিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৭)
অন্য হাদিসে হজরত আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে আমার বান্দারা! আমি আমার নিজ সত্তার উপর জুলুম হারাম করেছি, অতএব তোমরা একে অপরের উপর জুলুম করো না।’ (সহিহ মুসলিম : ৬৪৬৬)।
এবার আর কোন সন্দেহ থাকে না ডা:জুলাই প্রস্তুতি নিয়েই এই সাহসিকতার কাজ করেছেন।
তবে পিটি শেষে উপস্থিত শিক্ষকরা ডেকে তাকে সতর্ক করেন এই বলে যে এই ঘটনা যেন এই মাঠের বাইরে কেউ জানতে না পারে। সাথে এটাও বলে সাহসিকতা ভালো, কিন্তু তার চেয়ে বেশি কিছু আপনি করে ফেলেছেন।
এর কিছুদিন পর দেশব্যাপী হত্যাযজ্ঞের পর সরকার উপহাস করে কালো ব্যাজ ধারন করতে বলে।
সেই ডাঃ জুলাইয়ের নেতৃত্বে সব ডাক্তার সেইদিনের পুরো ক্লাসে অফিসিয়াল কালো ব্যাজ প্রত্যাখ্যান করে।
সেদিন সকাল ৮ থেকে শুরু হওয়া ক্লাসে সব ছেলেরা লাল টাই পড়ে ছিল ইচ্ছাকৃতভাবে। বিকেল পর্যন্ত তারা এভাবেই ছিল; কিছু কিছু শিক্ষক তাদের এই সাহসিকতার প্রশংসাও করছিল।
৫ আগস্ট যেদিন বিজয় এলো,তখন সেই ডাক্তারদের উচ্ছ্বাস কে দেখে!
তারাও সামিল হয় বিজয় মিছিলে। মিছিলে থাকা জেন জি দের দিকে তাকিয়ে তারা কিছুটা হীনমন্যতায় ভুগছিল।
এই বয়সে এই ছেলেরা জান দিয়ে একটা বিজয় এনে দিয়েছে, সেখানে তাদের অবদান খুবই মামুলি।
সরকারি দ্বায়িত্বে থেকে এর বেশি কি করা আদৌ সম্ভব ছিল? এইটুকু স্বান্তনা নিয়ে ওরা এগিয়ে যায় মিছিলের সাথে।
৩৬ জুলাইয়ের বিজয় মিছিল।
(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
Author:
সাজ্জাদ শরীফ, পলিটিকাল মিমার