নারীদেরকে অদৃশ্য করে দেবার সকল ধরণের পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে নারীদের ঐক্য কামনা করছি।
“বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ বর্তমানে অন্যতম বৃহৎ নারী শান্তিরক্ষীপ্রেরণকারী দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচয় লাভ করেছে, আমরা তাদের জন্য একটা জোরে হাততালি দেই,” শুনে মুহুর্মুহু হাততালিতে ফেটে পড়লো সেনাকুঞ্জের মিলনায়তন। বাংলাদেশের মানুষের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত নেতা মুহাম্মদ ইউনুস নিজেও বক্তব্যের এই পর্যায়ে এসে উপস্থিত অতিথিদের সাথে হাততালিতে বাংলাদেশের নারীদেরকে শুভেচ্ছা জানালেন। সশস্ত্র বাহিনী দিবসে সেনাকুঞ্জে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের অনেকগুলো সুন্দর মুহূর্তের মধ্যে এই মুহূর্তটা ছিলো অন্যতম। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের নারীরা সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয়বারের মত চ্যাম্পিয়ন হলো। আর তারও বেশ কিছুদিন আগে বাংলাদেশের নারীরা একটা গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক কর্তাস্বত্ত্বার সাথে নতুনভাবে পরিচিত হয়েছে। জুলাই মাসের প্রথম থেকেই শিক্ষার্থীরা পুরানো কোটা পদ্ধতি ফের ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনায় যখন ফুঁসছিলো এবং প্রায় প্রতিদিন কোন না কোন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী দিচ্ছিলো, সেই সময়, ১৪ জুলাই পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা তখন আগুনে তুষ ঢালেন তার “রাজাকারের নাতিপুতি” মন্তব্যের মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে শত শত শিক্ষার্থী রাত দশটায় মিছিল করতে করতে রাজুতে এসে জড়ো হতে থাকে। সাধারণত ছাত্রীদের হলগুলোর গেট রাত দশটার আগেই বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এইদিন হলের মেয়েরাও দলে দলে তালা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক উমামা ফাতেমার একটা সাক্ষাৎকার থেকে এই অদ্ভুত সময়ের গল্প শুনছিলাম। যখন সারা দেশের বড় বড় সব লোকেরা শেখ হাসিনার কাছে মোটামোটি বিক্রি হয়ে গেছে, যখন দেশের সচেতন বিবেকের রোলে অভিনয় করে যাওয়া লোকেদের একটা শক্তিশালী গ্রুপ তৈরি হয়ে গেছে যারা সময়ে সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের হালকা বকে ঝকে দেন, তবে শেখ হাসিনার সরাসরি সমালোচনা তারা করে না কখনো (এখনো এদের অনেকেই তা করছে না)। মোটকথা, শেখ হাসিনার প্রতি সরাসরি আঙ্গুল তুলে কথা বলার, তাকে দায়ী করে মিছিল করার অভিজ্ঞতাই বাংলাদেশের মানুষ হারিয়ে ফেলেছিলো। সুতরাং ১৪ তারিখ গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হামলা উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা যখন শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে স্বৈরাচারী বলে স্লোগান দেয় সেই মিছিলে নারী শিক্ষার্থীরা ছিলো অগ্রভাগে। মূলত তারা ছাত্রদের ওপর হামলা ঠেকানোর জন্য বর্ম হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছিলো। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অসাধারণ সব ছবি, ছোট ছোট ভিডিও আমাদেরকে সাহস জোগায়। একটি মেয়ে অদম্য সাহস নিয়ে পুলিশের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে যায়, ভাইকে ছেড়ে না দিলে সে গাড়ির সামনে থেকে সরবে না। ঠাকুরগাঁওয়ের এক দল মেয়েকে দেখেছি পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে দৃঢ়, সাহসী এবং ক্ষুব্ধ গলায় চিৎকার দিয়ে মিছিল করছে, তাদের স্লোগান ছিলো, “কে এসেছে কে এসেছে, পুলিশ এসেছে, পুলিশ এসেছে, কী করছে কী করছে? স্বৈরাচারের পা চাটছে।“ বিভিন্ন এলাকায় নারীরা মিছিলে খাবার পানি নিয়ে গেছেন, ছেলেমেয়েদেরকে থাকতে দিয়েছেন। আরও দেখেছি, ছেলেকে পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর মা তার পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন। তখনো কিন্তু হাসিনা ক্ষমতায়, রেজিমের দমন নিপীড়নের সমস্ত যন্ত্র তখনো পুরোদমে সক্রিয়। এর মাঝে এই নারীরা অপরিসীম সাহসের সাথে এগিয়ে না আসলে এই অভ্যুত্থান জনগণের অভ্যুত্থান হয়ে উঠতে পারতো না। বিলকিসের একটি অনলাইন প্রোগ্রামে সাক্ষাতকার নেবার সুযোগ হয়েছিলো এরকম কয়েকজন নারীর, যারা বলেছেন সন্তানকে মিছিলে খুঁজতে গিয়ে এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। অর্থাৎ,জুলাই বিপ্লবে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।
আমরা আরো দেখেছি নারীদের একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিলো প্রচণ্ড কনফিউজড। তারা একইসাথে হাসিনার অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করে ক্ষমতায় টিকে থাকার বন্দোবস্তে খুশি হতে পারছেন না, সেই সাথে তাদের মধ্যে একটা প্রচণ্ড আতঙ্ক আমরা লক্ষ্য করেছি। আতংকটা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ দুর্বল হয়ে গেলে ইসলামপন্থী দলগুলো ক্ষমতায় চলে আসবে অথবা তারা শক্তি অর্জনের এবং প্রকাশের সুযোগ পাবে। যা বাংলাদেশের সমাজে-রাষ্ট্রে নারীদের অবস্থানকে দুর্বল করে দিবে। বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দলগুলোর নারী বিষয়ক অবস্থান অপরিষ্কার এবং প্রশ্নবিদ্ধ। জামাতে ইসলাম যদিও বলে যে তারা নারীদের কাজে ব্যাঘাত ঘটাবে না, কিন্তু দলটির কোন কর্মসূচীতে নারীদের প্রকাশ্য অংশগ্রহণ দেখা যায় না। আর হেফাজতে ইসলামের প্রচুর লোক নারীদেরকে বেশি পড়ানোরই পক্ষপাতী না। সুতরাং, নারীদের বিষয়ে এই মনোভাবাপন্ন দলগুলো ক্ষমতায় গেলে নারীদের ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক।এছাড়াও, সংস্কার কমিশন সহ আরও নানান গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি চোখে পড়ছে না।
সুতরাং সচেতন অনেকেই প্রশ্ন করছেন, “নারীরা কোথায় গেলো?” কিন্তু বিষয়টা এমন না যে, তারা বলছেন,আগেই ভালো ছিলেন। ইন ফ্যাক্ট, বাংলাদেশের ছোট বড় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে আমরা সবসময় পুরুষের আধিক্যই দেখে এসেছি। সুতরাং, এমন না যে নারীরা হঠাত করে এই সমাজে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। বিষয়টা হচ্ছে, গণ অভ্যুত্থানের সময় নারীরা দেখতে পেয়েছে যে নারীদেরও প্রচণ্ড শক্তিশালী একটা রাজনৈতিক কণ্ঠ আছে। দেশের মানুষও দেখেছে নারীরাও রাজনীতি সচেতন আর প্রয়োজনে লড়তে পারেন। যদিও বাংলাদেশের মানুষের জন্য এটা কোন নতুন তথ্য হবার কথা না। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে নারীরা পুরুষের সঙ্গী হয়েছেন শক্ত কাঁধে। পিতার অবর্তমানে বাংলাদেশের সিঙ্গেল মায়েরা শক্তহাতে সংসারের হাল ধরেন। আমি নিজের মা সহ এমন অনেক মা কে দেখেছি, যাদের জীবনসঙ্গীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জীবনের পথঘাট গলিঘুপচিরর খবর রাখার তারা দরকার বোধ করতেন না। জীবনের মাঝপথে এসে কোনরকম পূর্ব প্রশিক্ষণ ছাড়াই কী দারুণ মানসিক শক্তি দিয়ে তারা ন্যুনতম সহায়তায় সন্তানদেরকে মানুষ করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কিংবা তারও আগে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে সবসময়েই নারীরা লড়েছেন। সুতরাঙ, নারীদের শক্তিতে আমার কখনো সন্দেহ ছিলো না।
প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র এই নারীদেরকে তাদের এইসব প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধে কতটা সহায়তা করছে?আওয়ামী লীগ এইক্ষেত্রে পশ্চিমের “ওয়ার অন্য টেরর” টেম্পলেট অনুসরণ করার চেষ্টা করছে। তারা দেশের একটা অংশের মানুষকে কনভিন্স করতে পেরেছে যে, আওয়ামী লীগের হাতেই নারী ও সংখ্যালঘুরা নিরাপদ। পশ্চিমারা যেমন আফগানিস্তান হামলা করেছে আফগান নারীদেরকে রক্ষা করার জন্য, তেমনি আওয়ামী লীগ আজীবন ক্ষমতায় থেকে যাবার ব্যাপারে বৈধতা আশা করে এই একই কারণে। এইটা অবশ্যই অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা যে তারা বাংলাদেশের একটা বিশাল অংশের নারী ও সংখ্যালঘুদেরকে আশ্বস্ত করতে পারেন নাই। সেইসাথে, আমাদের সচেতন নারীদের, সচেতন মানুষদের, যারা প্রান্তে থাকা মানুষদের কণ্ঠ ধারণ করতে চান তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও ধার দেয়া বেশ প্রয়োজন। আমরা যদি ইসলামপন্থী বনাম আওয়ামী লীগ এই বাইনারিতে দেশের সব মানুষকে ভাগ করতে চাই তাহলে একটা বিশাল অংশের মানুষকে জোর করে ভুলে যাবার আয়োজন করতে হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যেই নারীরা নিজের শরীর দিয়ে উপস্থিত হয়েছিলো চৌরাস্তায়, যেইখানে নানা মত নানা পথ এসে মিলেছে; সেই নারীরা তাদের উপস্থিতি দিয়েই তো বলে দিয়েছে যে তারা নারীদের অদৃশ্য করে দেবার এই রাজনীতি মানে না। তারা ভীষণভাবে দৃশ্যমান। আর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে ডঃ ইউনুসের বক্তব্য শুনে মনে হলো, তার সরকারও দেশের নারীদের অবস্থান সুদৃঢ় করার ব্যাপারে ইতিবাচক। অন্তর্বর্তীকালের সরকার একটি নারী কমিশনও গঠন করেছেন বলে সংবাদে প্রকাশ পেয়েছে। সরকারের কাছ থেকে নিশ্চয়ই নারীরা এইসব ব্যাপারে স্বচ্ছতা আশা করবে এবং সেইখানে জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি থাকবে এই আশা রাখি। আর, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মত নারীদেরকে দেখা দিতে হবে। উপস্থিত থাকতে হবে, আরো সচেতন হতে হবে। তারা যেন কোন অত্যাচারী শাসকের ডানার নিচে আশ্রয় নিয়ে সীমিত স্বাধীনতা উপভোগ করার বন্দোবস্তে জীবন কাটানোটাকেই নিয়তি মনে না করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তারা যেই সাহসের সাথে পরিচিত হয়েছিলো, যেই রাজনৈতিক কর্তাস্বত্ত্বা অর্জন করেছে সেইটাকে হাতছাড়া করার কোন অর্থ হয় না। নারীদেরকে অদৃশ্য করে দেবার সকল ধরণের পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে নারীদের ঐক্য কামনা করছি।