বাতাসে বৃষ্টি আসার গন্ধ যেন

আম্মু আমাকে দেখে অবাক! মাত্র ক’দিন আগে দেখে এসেছি আম্মুকে, আজকে আবার ধুম করে চলে আসলাম।

কোনো কথাবার্তা ছাড়াই আম্মুর রুমে ঢুকে আম্মুর পড়ার টেবিলের চেয়ারটা আমার দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে তার সামনে মাটিতে আম্মুর দিকে পিঠ দিয়ে আসন পেতে বসে চোখ বন্ধ করে বললাম, মাথায় তেল দিয়ে দাও।

আম্মু আরো অবাক!

আমি চুলে তেল দেই না।

সেই যে আব্বুম্মুর ঘর ছেড়েছি আলিমে পড়ার সময়, আম্মু আর জোড় করে ধরে চুলে তেল দেয়ার চান্স পায়নি, আর আমি নিজে নিজে চুলের যত্ন করবো? হা হা! তাহলে তো হয়েছিলোই!

আম্মু একটু অবাক হয়ে বললো ‘তুই ঠিক আছোস?’

আমি কি ঠিক আছি?

কী জানি।

আম্মু চান্স পেয়ে এখন তেল চুপচুপ করে দিচ্ছে চুলে।

আমি কিছু বলিনা। আমার চুলে আম্মুর হাতের ছোঁয়া লাগছে, এতেই আমি শান্তিতে চোখ মুদে থাকি।

আম্মু কী কী যেন বলেই যাচ্ছে।

আমি কিছু শুনি কিছু শুনিনা।

বড়ভাইয়াদের এলাকার মসজিদে সেদিন কার যেন জানায়া হয়েছে।

শিবিরের কে যেন বাংলাভিশনে ইন্টার্ভিউ দিয়েছে, আমি শুনেছি কিনা… আমি দূর্বোধ্যভাবে এমনভাবে হু বলি, যাতে বুঝার আসলে উপায় নেই শুনেছি নাকি শুনি নাই।

সেদিন কুর’আনে কীসের যেন একটা আয়াত পেয়েছে সেটা নিয়েও কী যেন বলছে আম্মু…

কোন আন্টি আমার ফেইসবুকের কোন একটা লেখা নিয়ে কমপ্লেইন করেছে তাও বলছে। এত বড় হইছি, দুই মেয়ের মা হইছি, তারপরও এখনো আমার নামে কমপ্লেইন শুনতে হয় আম্মুকে, সেই দুঃখ বলছে আম্মু আকারে ইংগিতে…

আমি কিছু শুনি কিছু শুনিনা।

এত বছর লেগেছে আমার বুঝতে, কিন্তু এখন বুঝি, আম্মু এত কথা বলে যখন আম্মু আসলে অন্য কিছু বলতে চায়। আমি বুঝি এই হঠাৎ মাথায় তেল দিয়ে দেয়ার আবদারে আম্মু বিচলিত, আম্মু ফিগার আউট করতে চাচ্ছে আমার সমস্যা।

কিন্তু উল্টা আমাকে নিয়ে তার সমস্যার কিস্তি খুলে বসেছে!

দীর্ঘস্বাস আসতে চাচ্ছিলো বুক ঠেলে, কোৎ করে গিলে ফেলি। আম্মু টের পেলে সর্বনাশ।

মায়ের চোখ!

আম্মু যত বুড়া হচ্ছে, তত আরো বিচলিত হয়ে উঠছে সন্তানদের নিয়ে।

যে সন্তানদেরকে ন্যানো সেকেন্ডে রাজনীতি আর ধর্মের জন্য কোরবান করে দিতে যার একটুও ঈমান নড়বেনা, কিন্তু মা তো! বয়সের সাথে সাথে এখন আম্মু এখন আর বিচলতাগুলো লুকাতে পারেনা।

আমার যেন দীর্ঘশ্বাসের সাথে যুদ্ধ চলে। ঠেলে বুকের ভিতর ফেরত নিতে হিমশিম খাই।

একটা কথা বলিনা। চুপ করে শুনি আর চোখ বন্ধ করে আম্মুর আঙ্গুলের ছোঁয়া নেই চুলের সিঁথিতে সিঁথিতে।

ফেরার পথে গাড়ী এলাকার রাস্তা ছেড়ে হাইওয়েতে উঠতেই জানালা দিয়ে আসা বাইরের আরামের বাতাসে দুই মেয়ে ঘুমিয়ে গেলো।

আমি একহাতে হুইল ধরে আরেক হাতে পাশে বসা বড্ডার হাঁটুতে হাত রাখি।

মেয়েটা টীনেজে পা দেয়ার পর থেকে ছুঁতেই দেয় না তাকে।

তারপরও যখন তখন তাকে জোড় করে জড়িয়ে ধরি। খুব বিরক্ত হয়। বলে ‘মা! ছাড়োতো!’

আমি তখন ইচ্ছা করে তাকে জ্বালাতে আরো বেশী করে টাইট করে জড়িয়ে ধরে রাখি।

গাড়ীর রিয়ার ভিউ মিরর দিয়ে দেখি ছোটু পিছনে সিটবেল্টের ভিতরেই পাশের সীট হাফ নামিয়ে দিয়ে তার উপর মাথা রেখে ঘুমুচ্ছে।

জানালার সব কাঁচ নামিয়ে দেই।

হু হু করে বাতাস এসে ধাক্কা দিচ্ছে মুখে, স্কার্ফে, চুলে, গায়ে…

অমাবস্যার বেশী দিন বাকী নেই, তাইই হয়তো রাত এত অন্ধকার! সেই অন্ধকারেও বুঝা যাচ্ছে কালো কালো মেঘ জমেছে আকাশে। এজন্যেই বাতাস হয়তো এমন হালকা ঠাণ্ডা।

বাতাসে বৃষ্টি আসার গন্ধ যেন।

বৃষ্টি কি আসবে?

Author

Previous Post
Next Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »