ডাস্টবিন ময়লা হয়, কিন্তু গায়ের রঙও যে ময়লা হতে পারে, এই উপমহাদেশে না থাকলে কেউ বোধহয় জানতো না! রেসিস্ট অর্থে আমরা বাঙালিরা বর্ণবাদী কিনা তা ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু গায়ের রঙের এই বিশেষ বিচারে এদেশের মানুষের বর্ণবিদ্বেষী চরিত্র দিবালোকের মত উদ্ভাসিত। কালো বা শ্যামলা গায়ের রঙ আমাদের এতই চোখের বিষ যে আমরা বলি, “মেয়ের গায়ের রঙ ময়লা”। কতই না অদ্ভুত! ময়লা মানে অপরিষ্কার, গায়ের রঙ পরিষ্কার বা অপরিষ্কার হতে পারে?! এই এক শব্দের মধ্য দিয়ে অজ্ঞাতসারেই আমরা আমাদের বর্ণবিদ্বেষের প্রকাশ ঘটাই বৈকি! এহেন বিদ্বেষ আমাদের সত্ত্বার বড় গভীরে গ্রন্থিত। যুগ যুগ ধরে লালিত-পালিত। প্রকৃতিদত্ত কারণে যে দেশের বেশিরভাগ মানুষের রঙ শ্যামলা, সেখানে শ্যামলা রঙ নিয়ে জন্মগ্রহণ যেন এদেশি মেয়েদের বড় এক ‘জন্মপাপ’! গাঢ় বর্ণধারী নারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ এখানে, অথচ এই গাত্রবর্ণ তাদের জীবনকে সুখপ্রদ হয়ে উঠতে দেয় না।
কী অদ্ভুত আত্মঘৃণা আমরা লালন করি! “সাদা” মানুষের সভ্যতার শিখরে আরোহণ ও অবস্থান আমরা দেখেছি বিমোহিত চিত্তে। মনে মনে তাদের মত হতে চেয়েছি। তাদের শিক্ষা, তাদের সংস্কৃতি আত্মস্থ করে ধন্য হতে চেয়েছি। তাদের গায়ের রঙ আমাদের তাই মনমুগ্ধ করে রেখেছে। তাদের দ্বারা শাসিত হয়ে এই ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স আরও পাকাপোক্ত হয়েছে। আর আমাদের এই মনস্তত্ত্ব বুঝে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো “Fair & Lovely” (এখন সম্ভবত “Glow & Lovely”) ধরণের অসংখ্য অবমাননাকর বিজ্ঞাপনে টিভি, সংবাদপত্র, বিলবোর্ড এবং আমাদের মনকে ভরিয়ে রেখেছে। Skin-whitening ক্রিম দিয়ে বাজার সয়লাব, সব স্তরের ‘ময়লা’ মেয়েদের পরিষ্কার করে তোলার জন্য। গভীরে গ্রন্থিত বর্ণ-বিদ্বেষ থেকে আমরা বেরিয়ে আসব কি, চমৎকারিত্বের সাথে আমাদের মন-মগজে আরও প্রোথিত করা হচ্ছে! বিজ্ঞাপনী চেতনা আর আমাদের ধ্যান-ধারণার সফল অনুরণন ঘটছে। “সোনার হাতে সোনার কাঁকন, কে কার অলংকার” — আমাদের চোখ এই ‘স্বর্ণালি’ রঙের মোহে মাত্রাতিরিক্ত মোহাবিষ্ট।
শ্যামারা “ময়লা”, আর ফর্সারা “গোলাপি”, “দুধে-আলতা”, “কাঁচা হলুদের মতো” ইত্যাদি কত বিশেষণ! ছোটবেলায় এমন অদ্ভুত সব বিশেষণ শুনে আমার মেয়ে বলতো, “মা, মানুষের রঙ কি এমন কখনও হয়?! আমরা তো ব্রাউন, তাই না?” ছোট্ট শিশুও যা বুঝতে সক্ষম, আমাদের সাবালক মন-মগজ তা অনুধাবনে অপারগ। হ্যাঁ, আমরা বাদামী। নানা মাত্রায় বাদামী, এই যা। আমাদের জন্য এটাই প্রাকৃতিক, কিন্তু তাতে আমাদের মন ভরে না। ঔপনিবেশিক দাসত্বের স্মৃতি-কাতরতা আমাদেরকে দারুণ সাদা-প্রেমিক করে রেখেছে আজও। আমাদের বিজ্ঞাপনগুলো বাঙালি মেয়েদের ফর্সা (যা আজকাল “উজ্জ্বল” বা “গ্লোয়িং” নামে মোড়কাবৃত করা হচ্ছে) হয়ে পৃথিবী জয় করার মোহময় স্বপ্ন দেখায় আর এরই সাথে সমাজের আজব বর্ণ-বাতিককে আরও জোরালো করে রাখে।
রঙের মোহ সব শ্রেণীতে সমান প্রসারিত, তবে শ্রেণীভেদে তার রূপ ভিন্ন। অনেক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে মেয়েদেরকে বেশি চা খেতে নিরুৎসাহিত করা হয়, কারণ নাকি “রঙ ময়লা হয়ে যাবে”! ময়লা প্রতিরোধে মধ্যবিত্তের কন্যা তাই প্রাণপ্রিয় চা বর্জন করে। গায়ের রঙ ফর্সা হবে এই ‘লোভ’ দেখিয়ে অনেক মেয়েশিশুকে ফল খেতে উৎসাহিত করা হয়! হায়রে কপাল! ফল খাবার শতেক উপকারিতা থাকলেও এই আকর্ষণের কাছে যেন বাকি সবই নগণ্য! আমার এক বান্ধবী ছিল, আকর্ষণীয় চেহারা আর অপরূপ হাসিতে চমৎকার একটি মেয়ে। কিন্তু সে বেচারির পুরো কিশোরীবেলা আর তরুণীকাল কেটেছে রঙ ফর্সা করার কষ্টকর সাধনায়। এমন হাজারো মেয়ে পাওয়া যাবে এখনও। মধ্যবিত্ত ঘরের শিক্ষিত শাশুড়িরা ছেলের জন্য শিক্ষিত বউ খোঁজেন ঠিকই, কিন্তু পুত্রবধূ হিসেবে বিবেচনার জন্য প্রাথমিক যোগ্যতা এখনও ফর্সা গায়ের রঙ। “মেয়ের চেহারা মিষ্টি, কিন্তু রঙটা ময়লা”— আপসোস, ঘরের বউ আর করা হয়ে ওঠে না। শ্যামলা একটি মেয়ে কখনই যেন ঠিক সুন্দর হয়ে উঠতে পারে না, সৌন্দর্যের নিক্তিতে তার অর্জন বড়জোর “মিষ্টি” হতে পারা।
নিম্নবিত্তে বর্ণ চেতনা আরও ভয়াল রূপে উপস্থিত। কালো মেয়েদেরকে কখনও মরতে পর্যন্ত হয় শুধুই কালো বলে। গরীবের ঘরে মেয়েশিশুর জন্ম এমনিতেই পরিবারে নিরানন্দ বয়ে আনে। আর সেই শিশু যদি হয় শ্যামবর্ণা (যা কিনা অধিকাংশ এদেশি শিশুই), তবে সেই আনন্দহীনতা রূপ নেয় এক অন্ধকার দুর্ভাবনায়। কারণ রঙের গাঢ়ত্বের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়বে কন্যার ভবিষ্যৎ যৌতুকের পরিমান। সূর্যরশ্মির ক্ষতিকর দিক চিন্তা করে নয়, গায়ের অমূল্য রঙ বাঁচাতে মধ্যবিত্তের মেয়ে মাথায় ধরে ময়লা-রোধক ছাতা! গরীবের মেয়ের তো অতশত পোষায় না, জীবন-ধারণের নিমিত্তে তাই ওরা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে থাকে। বিয়ের সময় এলে বাঁধে বিষম বিপত্তি, কারণ গাত্রবর্ণের গাঢ়ত্বের সাথে যৌতুক আনুপাতিক। কালো মেয়ের জন্য বিয়ের সেতু পাড়ি দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কোনমতে পার হলেও শ্বশুরবাড়ির গঞ্জনা তার নিত্যসঙ্গী বনে যায় – “রঙ তো দেখি হাঁড়ির তলার মতো”। “কাকের মতো” রঙের অধিকারী হওয়ার দোষে যৌতুক আর নির্যাতনের পাল্লাও ভারী হতে থাকে। ছোটবেলা থেকে এরা অনেকেই শুনে এসেছে, “তুই মরতে পারিস না!” অসহায়ত্ব থেকে নিঃসৃত প্রিয়জনের এই অভিশাপ কখনও সত্যিও হয়ে যায়! বড় হয়ে, বিয়ে হয়ে কেউ কেউ তারা মরেও যায় বটে। কালো হওয়ার ‘অপরাধে’ মৃত্যু। আমরা খবরের কাগজে তাদের মৃত্যু সংবাদ পাই, খবরের কাগজেই সেই সংবাদের ইতি।
কালো মেয়েকে এই সমাজ শৈশব থেকেই উপহার দেয় এক অদ্ভুত হীনমন্যতা। ‘ময়লা’ থেকে পরিষ্কার হওয়ার তাগিদে সময়, শ্রম ও চিন্তা ব্যয় করা তার নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। সেদিন নিউযফিডে দেখি কোন এক অনলাইন পোর্টালের পোস্ট, “গর্ভবতী মায়েরা কী কী খাবার খেলে গর্ভের সন্তান ফর্সা হবে।” অনেক লাইক-শেয়ার ছিল, মনে পড়ে। নিজের ত্বক শুধু নয়, এবার অনাগত সন্তানের ত্বকের রঙও চিন্তায় রাখতে হবে বৈকি! কালো হওয়ার ‘জন্মপাপ’ ঘোচাতে কত ক্রিম-স্নো-পাউডার-প্যাক মাখামাখি! আজন্মের এই ‘কালিমা’ তাও ঘোচে না কিছুতেই। ঘুচবে কি? কালিমা ত কালো মেয়ের দেহে নেই, কালিমা মাখা আমাদের সমাজ মানসে। আমাদের নিজেদের মনে ময়লা জমেছে বলেই তো অন্যের গায়ের রঙে ময়লা দেখতে পাই। চামড়ার রঙের অর্থহীন পর্দা আমাদেরকে অন্ধ বানিয়ে রেখেছে।
একটি ক্ষেত্রে এ সমাজের শ্রেণীভেদ লুপ্ত, তা হলো নারীর গায়ের রঙ। সমাজের সব স্তরে প্রায় সমান প্রবাহিত, শুধু প্রকাশের ধরণটা কোথাও স্থূল, কোথাও রাখঢাকের আড়ালে। রঙের মাত্রায় সৌন্দর্যের পরিমাপ আর সেই সৌন্দর্যের বিচারেই একটি মেয়ের সামগ্রিক মূল্যায়ন! সমাজের সর্বস্তরে প্রচলিত এই বর্ণ-প্রথা আমরা কবে ভাঙতে পারবো? ভাঙতে চাইবো কি কখনও? একটি মেয়েকে রঙের ক্যানভাস হিসেবে না দেখে বিশুদ্ধ দৃষ্টিতে সবটুকু মানুষটাকে দেখতে পাবো ঠিক কবে?
[poriborton.com-এ প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৩ সালে, কিছুটা পরিবর্তিত]