আগস্ট মাসের ৭ তারিখের একটা ঘটনা, আগের দুইদিন বাসায় ময়লা নিতে কেউ আসে নাই। আমরা নিজেরাই গিয়ে বাইরে ফেলে আসছি। শুনতে পারছি যে ময়লা সংগ্রহকারীরা যাদের কাছ থেকে বেতন নেয় তারা পালায়া যাওয়ায় নতুন ব্যবস্থা দাড়াইতে সময় লাগতেছে। যাই হোক ৭ তারিখও ধারণা করে রাখছি যে বাসায় কেউ আসবে না ময়লা নিতে। আমি তখন তৈরি হচ্ছি যে আবারও প্যাকেট করে ময়লা ফেলে আসবো। এর মধ্যে হঠাৎ বাসায় বেল বাজলো, দেখি ৩ জন লোক এসেছে তারা ময়লা কালেক্ট করতেছে। ওই সময়টা ছিলো লাঠি হাতে রাস্তায় ডাকাতের জন্য পাহারা দেওয়ার সময়, সারা দিন টেনশন কি থেকে কি হবে আর মধ্যরাত পর্যন্ত নিচে নামি বন্ধুদের সাথে মহল্লা পাহারা দিতে।
এখন ওইসময়েই তাদেরকে ময়লা নিতে আসতে দেখে আমার মাথায় হঠাৎ অন্য একটা চিন্তা আসলো। এই যে ময়লা সংগ্রহের কাজটা, বাংলাদেশের সবচেয়ে শারীরিকভাবে পরিশ্রমের একটা কাজ। ময়লার প্রকট দূর্গন্ধ সহ্য করে তারা এই ভয়ংকর কঠিন কাজটা করে যাচ্ছে এবং আমার বিশ্বাস এর জন্য তারা যা অর্থ পায় সেটা তার প্রাপ্যের তুলনায় কিছুই না।
এখন কথা হচ্ছে ৭ আগস্ট যে ৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক লোক মিলে আমার বাসায় ময়লা নিতে আসলো আমার বাসায় পুরুষ মানুষ মাত্র ২ জন- আমি আর আব্বু। দেশে তখন পুলিশ নাই, কোন সমস্যায় আর্মিকে ডাক দিলে হয়তো ২-৩ ঘন্টা পরে আসতে পারে। এই অবস্থাতে এই ৩ জন মিলে যদি আমাদের বাসাতে ডাকাতিও করতো তাও তাদেরকে বাধা দেওয়ার কেউ ছিলো না। কিন্তু তারপরেও তারা তাদের কাজ, তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। যে সমাজ বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বন্দোবস্ত তাদেরকে প্রায় কিছুই দেয় নাই তার প্রতি তারা একপাক্ষিকভাবেই তারা দায়বদ্ধতা দেখিয়ে যাচ্ছে। যদিও অভিজ্ঞতাটা অনেকটা দূরবর্তী তাও আমিও জুলাই মাসে একটা রোটেশন ব্লক যেখানে হয়তো নানা প্রকারের বিপদের কথা তুলে না গেলেও পরবর্তীতে ম্যানেজ করা যেতো সে ডিউটিও দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই গুলি টিয়ারশেল ইন্টারনেট শাটডাউনের মধ্য দিয়েও করে গেছি। এবং আমার এই করে যাওয়ার মধ্যে তেমন স্পেশাল কিছু নাই কারণ, দেশের অধিকের অধিকাংশ মানুষ সকল অরাজকতার মধ্যেই সমাজে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে গেছে।
স্টেট হেজিমনির কথিত পুলিশি প্রটেকশন ছাড়া চায়ের দোকান, ফলের দোকান চালিয়ে গেছে। সীমিত লোকবল দিয়েই হাসপাতাল চলেছে, যখনই সুযোগ পাওয়া গেছে মানুষ দোকানপাট খুলেছে। রিকশাওয়ালা মামারা নিজেদের নিরাপত্তার চিন্তা না করে আহতদের হাসপাতাল পৌছে দিয়েছে, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষজন নিজেদের সাধ্যমত সাহায্য করেছে। ব্যক্তি পর্যায়ে আমাদের এই কাজগুলা অসাধারণ কিছু না, কারণ আমরা সাধারণেরা সবাই এই কাজগুলা করেছি। কিন্তু সামগ্রিক দিক থেকে দেখলে আমাদের এই চরম অরাজ পরিস্থিতিতেও সামাজিক দায়িত্ববোধের চর্চার গল্পটা রূপকথার গল্পকেও হার মানাবে। অর্থনীতিবিদ পল সিব্রাইটের লেখা The company of strangers বইটা পড়লে দেখবেন সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর পাওয়ার ভ্যাকুয়াম চলাকালে রাশিয়ান রুবল যখন তেজপাতায় পরিণত হয় তখন মানুষ দ্রব্য বিনিময় প্রথায় ফেরত গিয়ে হলেও অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালু রাখে- জুতার বিনিময়ে দুধের বিজনেস করে, চিনির বদলে মাংসের দোকান চালায় এইরকম।
স্বল্প পরিসরে হলেও আমাদের এই অরাজক অর্থনীতি আর সামাজিক দায়িত্ববোধগত অবস্থান বিশ্ব ইতিহাসে পাঠযোগ্য একটা ঘটনা বলে আমার মনে হয়। এখন এই যে অ্যানার্কিস্ট ফাংশনিং, অরাজকতার মধ্যেও সমাজের ফাংশন চালায়া যাওয়ার উলটা উদাহরণও হয়তো অনেক দেওয়া যাবে। অরাজকতার সুযোগ নিয়ে লুটপাট হত্যার গল্পই আমাদের আশেপাশে বেশি চর্চিত হয়। এই কারণেই হয়তো আইনের বইতে একটা কথা বলে যে order in human society is not self-executive. মানব সমাজে, স্পেশালি অতি কমপ্লেক্স আধুনিক সমাজে নিয়ম নীতি নিজে থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় না, কোন একটা সিস্টেম বা বডির মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কিন্তু তারপরেও এই অরাজকতার মধ্যেও সামাজিক জীবন চালু থাকার কথাটা এই কারণেই আনলাম একটা কথাকে ফোকাস করতে যেটাকে অ্যান্থ্রোপলজিস্ট ক্লিফোর্ড গার্টজ বলছেন- Man is an animal suspended in webs of significance he himself has spun.. মানুষ নিজের বানানো অর্থময়তা বা ভ্যালু সিস্টেমের জালের মধ্যেই বসবাস করে। এই সমাজ রাষ্ট্র আইন অর্থনৈতিক সিস্টেমগুলা শুধুমাত্র হচ্ছে instrument of social co-operation, সমাজে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ বিশিষ্ট মানুষের একসাথে চলার, একসাথে কো-অর্ডিনেটলি কাজ করার সিস্টেম। এবং এই সিস্টেমগুলা জীবিত থাকে জনগণের নিজেদের তৈরি গল্পের মাধ্যমে, ন্যারেটিভের মাধ্যমে। আমরা নিজেরা মিলে নিজের দেশ সম্পর্কে নিজেদের অর্থনীতি সম্পর্কে, দেশে বিরাজমান ক্ষমতা, বাস্তবতা সম্পর্কে গল্প বানাই, আর প্রতিদিন নিজেদের সামাজিক অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সেই গল্পটাকে জীবিত রাখি।
এই গল্পটা হয়তো অনেককে অনেক কিছুই দিয়েছে, অনেককে কিছুই দেয় নাই, তবে শুভবোধের জায়গা থেকেই আমরা সবাই এই চর্চাটা করে গেছি। এই যে আগস্টের চূড়ান্ত অ-রাজকতার মধ্যেও আমরা অ-সামাজিক হই নাই, এই যে , we have trusted Bangladeshi society in spite of Bangladeshi state, এইটাই আমাদেরকে নতুনভাবে গড়ে উঠার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। এখন এই একপাক্ষিক গল্পটাকে কিভাবে সত্যিকারের বাস্তবতায় পরিণত করা যায় এইটাই সামনের দিনের চ্যালেঞ্জ। শতপ্রকারের উস্কানিমূলক কাজের মাঝেও পুলিশ ছাড়া একটা দেশের সমাজ যদি ৭ দিন সোসাইটাল কলাপ্স ঠেকায় রাখতে পারে সে সমাজের কাছে অসম্ভব কোন কাজ আছে আমি মনে করি না। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশকে একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জর্জরিত, পরনির্ভরশীল করদ রাজ্য হিসাবে দেখতে চাওয়া সাইকোপ্যাথদের চেয়ে এই দেশে দেশকে ভালোবাসা শুভবোধসম্পন্ন দায়িত্বশীল সামাজিক মনোবৃত্তিসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা বেশি। এবং আমার এই বিশ্বাস শুধু আবেগি বিশ্বাস না।
কোভিডের ক্রাইসিসের সময় থেকে শুরু করে নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে গিয়ে আবার আগস্ট মাসের টানা ৮-১০ দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় অনুপস্থিতিতে দেশের নিজেদের সাধ্যমত কমিউনিটি সেল্ফ অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে যেভাবে ডাকাত থেকে শুরু করে উস্কানিমূলক সাম্প্রদায়িক হামলা চালাইতে আসা অমানুষদের দমন করেছে, সেইসব -দেশের ভবিষ্যতের উপর ভরসা রাখা- সাধারণ মানুষদেরকে দেখেই যৌক্তিকভাবে আমি এই বিশ্বাস ধারণ করি। দেশের প্রতি আমাদের অবিচল ভালোবাসাই সেই সময়টাতে দেশের বিরুদ্ধে নানাবিধ চক্রান্তকে অতিক্রম করার সুযোগ দিয়েছিলো, সামনেও আমরা তাই পারবো প্রবলভাবে আশা করি।