স্বৈরতন্ত্রের বিপরীতে আমি ছিলাম, আছি এবং থাকবো

আমি নিউইয়র্কে থাকি, কিন্তু আমার হৃদয় ছিল সবসময় বাংলাদেশের রাজপথে—শহীদ মিনারের পাদদেশে, প্রেসক্লাবের সামনে কিংবা পল্টনের গর্জনে। আমি কোনো রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান নই। কিন্তু শৈশবে যাদের মুখে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছি, তাদের অনেকেই আজ গুম, নির্যাতন আর দমন-পীড়নের শিকার। নিজ দেশের মাটিতে তাদের এভাবে নিপীড়িত হতে দেখা—একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে মেনে নেওয়া অসম্ভব।

শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসন ছিল আধুনিক বাংলাদেশের দীর্ঘতম একদলীয় শাসনের প্রতীক। এই সময়টিতে দেশে দেখা গেছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে বাকস্বাধীনতা দমন, ভোটাধিকার হরণ, বিচার ব্যবস্থার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার। এক দলীয় শাসনের দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতে বাংলাদেশ যখন নতুন সম্ভাবনার খোঁজে ছিল, তখন তরুণ প্রজন্ম রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমার দেখা ৩৬ জুলাই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিপ্লবী দিন। এ দিন শুধু রক্তক্ষরণের নয়, বরং স্বপ্ন দেখার দিনও। এক মানবিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দাবিতে, নিজের ভাইকে হারানোর বেদনাকে শক্তিতে রূপান্তর করে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। আমি গর্বিত, কারণ এই প্রজন্ম ভীত হয়নি, বিক্রি হয়নি। তারা প্রমাণ করেছে—স্বাধীনতা কেবল একবার অর্জনের বিষয় নয়, তা রক্ষা করার দায় প্রতিটি প্রজন্মের।

আমি তাদের কাছে ঋণী। এ ঋণ শুধু আবেগের নয়, এ ঋণ দায়বদ্ধতার। সেই ঋণ শোধ করতে আমি লেখালেখি করেছি, ভিডিওতে মুখ খুলেছি, প্রবাসে থেকেও দেশের মাটির প্রতি দায়বদ্ধ থেকেছি।

আবু সাঈদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর আমার জীবন থমকে যায়। অফিস থেকে ছুটি নিই। জুলাই ১৭ তারিখে আমার স্বামীর অস্ত্রোপচার ছিল—আমরা দু’জনেই ঘরবন্দী, কিন্তু মনটা বন্দী ছিল না। শহরের যত মিছিল, সমাবেশ—কখনো একসাথে, কখনো আলাদা হয়ে উপস্থিত থেকেছি। মনে হতো, এ কষ্ট শুধু আমাদের ব্যক্তিগত নয়, এটি জাতির ব্যথা।

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি প্রজন্মের সাহস আমাদের নতুন করে আশাবাদী করেছে। মনে হয়েছে, এ দেশ কেবল টিকে থাকবে না, নতুন করে গড়ে উঠবে। এই লড়াই কেবল রাজনৈতিক নয়—এই লড়াই ভবিষ্যতের জন্য, একটি মুক্ত, মানবিক রাষ্ট্রের জন্য।

এই লড়াইয়ের বীজ কিন্তু আজকের না। ২০১৮ সালে ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের রাজপথে নেমে আসা কিংবা ভোট ডাকাতির তিনটি জাতীয় নির্বাচন—সব মিলেই এই প্রজন্মের প্রতিবাদের জমি প্রস্তুত করেছে। এই তরুণরাই শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গণজাগরণ ঘটিয়েছে।

আমি একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতেই তো প্রবাসীরা ঘাম ঝরিয়ে অর্থ পাঠায়। কিন্তু সেই অর্থ যেন গণতন্ত্র হত্যার পেছনে ব্যবহৃত না হয়—এই উদ্বেগ থেকেই আমরা রেমিট্যান্স প্রবাহ বন্ধের আন্দোলন করেছি। সরাসরি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেই স্বৈরতন্ত্রের শিকড় কাঁপানো যায়—এই বিশ্বাস থেকেই নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে প্রশ্ন করি রিজার্ভ চুরির বিষয়ে। হয়তো তাতে অনেকের বিরাগভাজন হয়েছি, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি—নির্বিচারে মৌনতা কোনো বিকল্প নয়।

আমি দেশকে ভালোবাসি। এই ভালোবাসা গায়ে গায়ে লেপ্টে থাকা আবেগ নয়—এটা একটি দায়িত্ব। দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন দেখতে চাই। তবে তা কেবল সম্ভব তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে, যারা নিজেদের রক্ত, সাহস এবং স্বপ্ন দিয়ে দেশটাকে নতুন করে গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় দেখিয়েছে।

আমার অবস্থান স্পষ্ট—আমি কোনো দলের, কোনো নেতার পক্ষে নই। আমি জনগণের পক্ষে। আমি ছিলাম, আছি এবং থাকবো। কারণ বাংলাদেশ কারো পারিবারিক সম্পত্তি নয়। এটি ১৬ কোটি মানুষের রক্তে, ঘামে গড়া একটি রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের মালিকানা আমরা কেউ ব্যক্তিগতভাবে দাবী করতে পারি না। এ রাষ্ট্র হবে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও সমানাধিকারের।

এটাই আমার শপথ।

Author: রওশন হক, 

একজন প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা, লেখক ও সাংবাদিক, থাকেন নিউইয়র্কে। 

পেশাগতভাবে মেডিসিন কোম্পানিতে কোয়ালিটি কন্ট্রোলার হিসাবে কাজ করছেন। 

বিবাহিত দুই কন্যা সন্তানের জননী

Author

Previous Post
Next Post
Translate »