বিগত জীবনের কোন জুলাইয়েই জানতাম না সন্তানসম অচেনা কারো জন্য চিৎকার করে কাঁদতে পারবো এমন মা আমি। অজস্র মানুষের রক্তাক্ত শরীর দেখে অক্ষম আক্রোশে কাউকে ক্ষতবিক্ষত করতে চাইবো নিরীহ এই আমি। একটা স্বাধীন দেশের শাসক যা করেছে তার নাগরিকের সাথে সেই সব দৃশ্য দেখে আমাদের জীবনটাই যেন বদলে গেছে অনেকখানি।
আমৃত্যু আর ভোলা যাবে না সেসব।
সে যে কী দুঃসহ দিন আর রাত গিয়েছে আমাদের, আমরা জানি। ছটফট করে অবশেষে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি সকলের সাথে। আশ্রয় দিয়েছি পালাতে থাকা ছেলেমেয়েদের।
আশ্রয় দিয়েছি বলে রাস্তা থেকে রামদা আর হকিস্টিক দেখিয়ে গেছে জাতির পিতার ভালো দলের ভালোমানুষের ছেলেরা।
জুলাই মানেই একটা আনন্দের মাস ছিলো আমার। তিন বোন, মা, ভাগ্নের জন্মদিন ছাড়াও আরো অনেক প্রিয় মানুষের জন্মদিন থাকে এই মাসে। আমাদের পরিবার দু হাজার চব্বিশের জুলাইয়ে কারো জন্মদিনই পালন করেনি। রক্তের সাগরে ভেসে আনন্দ করা যায় না, তাই করেনি।
অথচ রক্তের সাগরে ভেসে অনেকের কী যে আনন্দ, সেও দেখেছি গত একটা বছর ধরে। খুনগুলোকে অস্বীকার করতে দেখলাম, সন্দেহ করতে দেখলাম। নিহতদের নাম ধরে ধরে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ সে-ও তো চলছে এখনো। আরো দেখলাম খুনীদের আপন করে নিতে, দেখলাম আন্দোলনকে পকেটে পুরে লাভের আগ্রহ, দেখলাম যে কথা রাখার জন্য এত মানুষ জীবন দিলো, হাজারো মায়ের বুক খালি হলো নিষ্ঠুরভাবে, সে কথা ভেসে গেল পদ্মা মেঘনা যমুনার জলে। সেই আন্দোলন ব্যবহার হতে লাগলো অবুঝ নিহত মানুষগুলোর সতীর্থদের হাতে।
দেখলাম আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসার চেয়ে কার সুবিধাগুলো পাচ্ছে অগ্রাধিকার। সবারই আগ্রহ নিজেদের লাভের দিকে। পকেট ভারি থেকে ভারিতর হচ্ছে কার। দেখলাম আহতরা সুস্থ হলেও দখল করে রেখেছে হসপিটাল। যেখানে প্রকৃত অসুস্থরা পাচ্ছে না চিকিৎসা।
অথচ আন্দোলনে যারা গিয়েছিলো তারা জানতো একটা সুন্দর দেশ হবে৷ সোনার বাংলাদেশ। প্রাণভরে সবাই গাইবে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি। যেখানে মানুষ ই শুধু পাবে অগ্রাধিকার। মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা বাসস্থান ভাত-কাপড়ের হবে সংস্থান। যারা চলে গেল, জানতেও পারলো না তাদের সাথে বেঈমানী করা হয়েছে। যারা রয়ে গেল তারা কেউ শকুনির পাশাখেলার যুধিষ্ঠির অর্জুন ভীম। কেউ দুর্যোধন দুঃশাসন। কেউ বা চক্ষুবিহীন দর্শক অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্র।
আর বাংলাদেশটা যেন দ্রৌপদী, নাথবতী অনাথবৎ।
বাংলাদেশের কিছু মানুষের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। তার কন্যা, নিজেকে যিনি মহামান্যা ভাবতেই ভালোবাসতেন। তিনি নিজের দেশ ছেড়ে, দল ছেড়ে শুধুমাত্র প্রাণের ভয়ে পালিয়ে আছেন অন্য দেশে। সেখানে থেকেও তিনি খুন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন মাঝেমধ্যেই।
ক্ষমতায় থাকার জন্য এতগুলো মানুষকে হত্যা করার নির্দেশ দিতে যার বুক কাঁপেনি, সে দূরে গিয়েও খুনের কথাই ভাববে এ আর আশ্চর্য কী!
চাক্ষুষ খুনী হওয়ার পরও, পালিয়ে যাওয়ার পরও যাকে ভালোবাসে এখনো অসংখ্য মানুষ। তাকে আবারো খুন করানোর জন্য ক্ষমতায় আনতে চায় অসংখ্য মানুষ। এবং আসলে তারাই মেটিকুলাস ডিজাইন করে। আন্দোলনের ঐক্য ভেঙে দিতে চায়। সেজন্য মাতৃভূমিকে ক্ষত বিক্ষত করতে, দেশের মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে তারা সর্বতোভাবে চেষ্টা করে চলছে একটা বছর ধরে।
তাদের যদি অভিশাপ দিয়ে বলতে পারতাম- তোমাদের সাথে, তোমাদের সন্তানদের সাথেও যেন ঠিক এমনটাই ঘটে।
পারিনা। একজন মা কখনো এই অভিশাপ দিতে পারে না।
তাই নিরবে দেখে যাই আস্ফালন।
যে মা দেখেছে সাঁজোয়া যান থেকে সন্তানের প্রাণহীন দেহ ফেলে দিতে নিছক একটা বস্তার মত। যে মা দেখেছে রিক্সার পা দানিতে করে নিয়ে যাচ্ছে রক্তাক্ত সন্তানকে। যে মা দেখেছে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে হিংস্র শিকারীর মত গুলি করছে তাদেরই প্রাণপ্রিয় সন্তানদের। ভ্যান গাড়িতে স্তুপ করে পুড়িয়ে দিয়েছে পাকবাহিনীর মত নিজের স্বাধীন দেশের পুলিশ, শুধুমাত্র একজন জাতির পিতার মহামান্যা কন্যা শেখ হাসিনার ক্ষমতায় থেকে দম্ভ করার ইচ্ছা চরিতার্থ করতে।
সেই মাও প্রতিশোধ চায়না। তারা চায় এই দেশটার ভালো হোক। যার জন্য তার সন্তানের জীবন গেল।
আমরা যারা এই জুলাইকে আমাদের মানুষ হবার পথে একটা পদক্ষেপ মনে করি, যারা শুধুমাত্র ক্ষমতাবানের এঁটোকাঁটা খেয়ে বেঁচে না থেকে মানুষের মত বাঁচতে চাই এই জুলাইয়ের মর্যাদা নিয়ে তারা শুধু পারব সেই মহামান্যাকে আজীবন ঘৃণা করতে। তাকে যারা ক্ষমতায় এনে রক্তের হোলি খেলতে চায় তাদের ঘৃণা করতে। তার জন্য যারা ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি আরো অনেক নীতির নামে দেশটাকে নিয়ে খেলছে তাদের ঘৃণা করতে।
জুলাই আমাকে অন্যের সন্তানকে নিজের সন্তান ভাবতে শিখিয়েছে। সন্তানহারা মায়ের কষ্ট অনুভব করতে শিখিয়েছে।
আবার জুলাই আমাকে তীব্র ঘৃণাও করতে শিখিয়েছে। এত ঘৃণা এত ঘৃণা আমি করি ওই ক্ষমতালোভী খুনী মহিলাকে , তত ঘৃণা আমি আমার অদৃশ্য শত্রুকেও করিনা।
সারা পৃথিবীতেই ক্ষমতালোভী রাক্ষস মানুষ অনেক দেখেছি আমরা। তারা টাকা খায়, জমি খায়, মানুষও খায়। অস্ত্র বানায়, অস্ত্র কেনে যুদ্ধ করে শুধুমাত্র মানুষ মারবে বলে। শিশুদের মারবে বলে।
কিন্তু নিজের পরিবারের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে নিজের দেশের মানুষকে, যে দেশের মানুষ ভালোবেসে তার পিতাকে বঙ্গবন্ধু বলে ডাকতো, সেই দেশের মানুষকে এভাবে পাখির মত গুলি করে হত্যার নির্দেশ দিতে যে পারে সে আর যাই হোক রাষ্ট্রনায়ক নয়, দুই সন্তানের মমতাময়ী মা নয়,
সে কোন দলের নেত্রী নয়। ভালোবাসা স্নেহ মমতা তার মধ্যে নাই।
তাকে আর যাই হোক ভালোবাসা যায় না। তাকে আদর করে ফিরিয়ে এনে কোলে বসানো যায় না। তাকে আমৃত্যু ঘৃণা করে যাব আমাদের সন্তানের খুনী হিসেবে।
জুলাই আমার জন্য এই ঘৃণাই রেখে গেছে।

Author: সালমা লুনা এনজিও কর্মী ও লেখক